আজ (০৪ নভেম্বর, ২০২৬) কক্সবাজার শহরের প্রধান নদী বাঁকখালী দখল ও দূষণের কবল থেকে রক্ষা এবং উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলােদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) কতৃর্ক “দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত বাঁকখালী নদী: আমাদের করণীয়” শীর্ষক আলোচনা সভা কক্সবাজারের হোটেল সী প্যালেসে অনুষ্টিত হয়।
উক্ত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জনাব আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা, সভাপতি সিভিল সোসাইটি। সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মো: মশিউর রহমান, এসিল্যান্ড, কক্সবাজার সদর, মো: নাজমুল হুদা— জেলা মৎস্য কর্মকর্তা; ড. বিমল কুমার প্রামানিক, উপপরিচালক কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর; পরক্রম চাকমা, প্রকৌশলী কক্সবাজার পৌরসভা; আতিকুর রহমান, উপসহকারী প্রকৌশলী, পাউবো, কক্সবাজার; । এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দূ। আলোচনায় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ও বেলার লিগ্যাল কোঅর্ডিনেটর এস. হাসানুল বান্না।
এস. হাসানুল বান্না বলেন, বেলা কতৃর্ক দায়েরকৃত জনস্বার্থূমূলক মোকদ্দমা (নং ৮৩২৫/২০১৪) — এর রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ গত ২৪ আগস্ট, ২০২৫ বাঁকখালী নদীকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা এবং দখলদারদের উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। তিনি তার প্রবন্ধে বাকঁখালী নদীর প্রধান সংকট হিসেবে নদীর সীমানা চিহ্নিত না করা, অবৈধ দখল ও দূষণকে অবহিত করেন। বাকঁখালী নদীতে বারবার অবৈধ দখল উচ্ছেদের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
আলোচনা সভায় উপস্থিত বক্তারা বলেন, ৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁকখালী নদী বান্দরবান জেলার পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎপন্ন হয়ে কক্সবাজার সদর উপজেলার মধ্য দিয়ে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে মহেশখালী চ্যানেলে পতিত হয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত পর্যটন নগরী কক্সবাজার শহরের প্রধান নদী হিসেবে বাঁকখালী নদীর অবদান বহুমাত্রিক। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া যাতায়াতের প্রধান পথই ছিল এ বাঁকখালী নদী। প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে বিভিন্ন এলাকার শত শত জাহাজ, ট্রলার এ নদীতে আশ্রয় নিত। বাঁকখালী নদীর দু’পারে অবস্থিত উপকূলীয় বনের সবুজ বেষ্টনী আশেপাশের জনবসতিকে রক্ষা করে আসছিল সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে। এ নদীতে একসময় প্রচুর পরিমাণে মহাশোল, চিংড়ি, বেলে, টেংরা, বাইট্টা এবং ইলিশ মাছ পাওয়া যেত। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও বিরল প্রজাতির লাল কাঁকড়া এ নদীতেই পাওয়া যেত। সভায় বক্তারা বাঁকখালীর প্রধান সমস্যাগুলো সমস্যাসমূহ তুলে ধরেন—
• নদীর দুই তীরে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের “কোস্টাল এণ্ড ওয়েটল্যাণ্ড বায়োডাইভারসিটি প্রকল্প” এর অধীন বনায়নের মাধ্যমে সৃষ্ট প্যারাবন কেটে সেখানে প্লট তৈরি করা হয়েছে। দখল করে তৈরি করা প্লটে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে;
• নদীর তীর দখল করে দখলি সম্পত্তির স্বপক্ষে দলিল তৈরি করেছে দখলদারেরা; ক্স কক্সবাজার পৌরসভার সকল ধরনের বর্জ্য নদীতে ফেলে নদীর তলদেশ ভরাট করা হচ্ছে। শহরের হোটেল—মোটেলের বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে এ নদীতে।
• নদীর আশেপাশের এলাকায় পাহাড় কাটার কারণে বর্ষাকালে কাটা পাহাড়ের মাটি পানির রাতে বিভিন্ন নালা, খাল—বিল হয়ে নদীতে এসে পড়ছে ফলে ভরাট হচ্ছে নদী;
• নদীর কোথাও কোথাও রাবারের ড্যাম দিয়ে এর গতিপথ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে;
• নদীর মৎস্যসহ মূল্যবান জলজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তির পথে। অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে ইলিশ ও মহাশোল;
• নদীতে যখন পানি থাকে না তখন রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকার বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে করা হচ্ছে তামাকের চাষ;
• এ নদীর পানি চাষাবাদের উপযোগিতা হারিয়েছে। ফলশ্রম্নতিতে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে অনেক কৃষক ও মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী;

রমিজ আহমেদ, সহসভাপতি, সিভিল সোসাইটি বলেন “বেলার আইনি পদক্ষেপের কারণেই এই শহরের পাহাড় এবং প্রাণ প্রকৃতি এখনো টিকে আছে।
গণমাধ্যমকমীর্ অন্তর পৌরসভার খুরুশকুল অংশে নদীর দখল ও দূষণ বন্ধে পৌর কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি নদীতে ময়লা—আবর্জনা ফেলা বন্ধে পৌরসভার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা জনাব শান্তনূর বলেন, নতুন ব্রীজ সংলগ্ন কস্তুরা ঘাটে প্যারাবন কেটে দখল হওয়া জায়গা দখলমুক্ত করা হলেও, প্যারাবন আর ফিরে আসেনি। প্যারাবন ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবী জানান তিনি।
মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের কক্সবাজার প্রতিনিধি বলেন, বাঁকখালীর নদীর রামু চেংরাঘাটা অংশে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হচ্ছে। সাথে চলছে তামাক চাষ। বালু উত্তোলন ও তামাক চাষ বন্ধের অনুরোধ জানান তিনি।
সংবাদকর্মী সৌরভ দেব বলেন, অবৈধ দখলদারদেরকে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বৈধতা দেয়। তিনি বলেন, অবৈধ দখলদারদের বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা সহ এসিল্যান্ড অফিস কতৃর্ক খাজনা নেয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন তিনি।
ড. বিমল কুমার প্রামানিক, উপপরিচালক কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর বলেন, এই মুহূর্তেই বাঁকখালি নদীর সকল সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে নয়তো সমস্যাগুলো সমাধানের অযোগ্য হয়ে পড়বে। তিনি উল্লেখ করেন, নদীর দূষণমুক্ত পানি যেমন মানুষের প্রয়োজন ঠিক তেমনি ফসল উৎপাদন করতেও প্রয়োজন। তাই
বাঁকখালী নদী দূষণ মুক্ত করার তাগিদ দেন তিনি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জনাব মো: নাজমুল হুদা বলেন, নদীতে ৩৫ প্রজাতির মাছ, ১০ প্রজাতির অন্যান্য জলজ প্রাণী রয়েছে। নদীকে দূষণমুক্ত না করতে পারলে এসব মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবে অচিরেই। তরল বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে দূষিত করছে যার প্রভাব আমাদের খাদ্য শৃঙ্খলেও পড়ছে। তিনি নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশল জনাব পরক্রম চাকমা বলেন, ২০২৮ সাল নাগাদ কস্তুরা ঘাট থেকে ময়লার ভাগাড় স্থানান্তর করা হবে।
কক্সবাজার সদরের এসিল্যান্ড জনাব মো: মশিউর রহমান কক্সবাজারে বালু উত্তোলন, পাহাড় কাটা নদী দখল—দূষণ নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি সকল সকল পরিবেশ বিধ্বংসী কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করার জন্য সাংবাদিকবৃন্দদের প্রতি আহবান জানান।
আলোচনা সভার সভাপতি জনাব আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, মানবসৃষ্ট বিপযর্য়ের জলন্ত উদাহরণ এ বাঁকখালি নদী। তিনি বলেন, নদী রক্ষায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় যে প্রকল্প গ্রহণ করেছে সে বিষয়ে জনপরিসরে ব্যাপকভবে আলোচনা হওয়া উচিত। তিনি যেসকল জায়গা দখলমুক্ত করা হয়েছিল সেগুলো যথাযথ সংরক্ষণের তাগিদ দেন । বাঁকখালী নদী দখলমুক্ত ও এর নাব্যতা ফিরে না আসলে শহরে জলাবদ্ধার মত নানা রকম ঝঁুকির আশংকা করেন তিনি।
স্থানীয় জনগন তাদের আলোচনায় উল্লেখ করেন যে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার নদীটি রক্ষায় ৪৭ কোটি ৫০ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যায়ে “কক্সবাজার জেলার বাঁকখালী নদী পুনরুজ্জীবিত, দখলমুক্ত ও দূষণমুক্তকরণ” শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করে যার মেয়াদকাল জানুয়ারি ২০২৬ থেকে জুন ২০২৮ পর্যন্ত। তবে নদীটি দখলমুক্তকরণ ও দূষণ বন্ধে উল্লিখিত প্রকল্প এবং আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তারা প্রকল্প ও নদী রক্ষায় আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে সে বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তার নিকট জানতে চান। জবাবে আতিকুর রহমান, উপ সহকারী প্রকৌশলী (পাউবো) বলেন, ৪ কিমি নদী খননের প্রকল্প রয়েছে। সামনের শুষ্ক মৌসুমে খনন কাজ শুরু হবে। ১.২ কিমির নদীতীর সংরক্ষণের কাজের টেন্ডার হয়েছে। শীঘ্রই কাজ শুরু হবে বলে তিনি জানান।
আলোচনা সভায় আলোচকবৃন্দ বাঁকখালি নদীকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আশু করণীয় হিসেবে নিম্নোক্ত কার্যক্রম গ্রহণ করার পরামর্শ প্রদান করেন—
• মূল ও বর্তমান প্রবাহ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করা;
• সীমানার মধ্যে থাকা সকল দখলদারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুতপূর্বক কার্যকরভাবে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা ও পরবর্তীতে সেটার মনিটরিং ও ফলোআপ করা;
• সকল দূষণের উৎস বন্ধ করা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা;
• কঠোরভাবে নদী সংলগ্ন পাহাড়কাটা বন্ধ করা;
• নদী তীরে বা নিকটবর্তী স্থানে তামাক চাষ বন্ধ করা;
• নদীর কোনো জায়গা ইজারা প্রদান না করা এবং ইতোপূর্বে ইজারা প্রদান করা হয়ে থাকলে তা বাতিল করা;
• দু’তীরে উপকূলীয় বন সংরক্ষণ করা ও ক্ষয়িত বন দেশিয় প্রজাতির বৃক্ষ দ্বারা বনায়নের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা;
• নদীতে থাকা রাবার ড্যাম অপসারণ করা;
• পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং—এর মাধ্যমে নদীর পূর্বের গভীরতা ও প্রসারতা ফিরিয়ে আনা;
• ডক ইয়ার্ডের স্থান পরিবর্তন;
• কস্তুরাঘাট থেকে ময়লার ভাগাড় এর স্থান পরিবর্তন করা;
• বাকঁখালী নদীর তীরে অবৈধ রিসোর্ট গড়ে উঠতে না দেয়া;
• বাকখালীর রামু অংশের বালুমহালের ইজারা বাতিল করা।



