সারসংক্ষেপঃ
সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণে একটি যুগান্তকারী অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে যা বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬ নামে পরিচিত। অধ্যাদেশটি বিগত ০৬ জানুয়ারি, ২০২৬ এ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ১৩টি অনুচ্ছেদযোগে প্রণীত এ অধ্যাদেশে বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণে বিভিন্ন কৌশল, নির্দেশনা ও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। বর্তমান সময়ের প্রত্যাশিত এ অধ্যাদেশে জীববৈচিত্র্য, বন, বনজ সম্পদ, বনভূমি, বৃক্ষ সংরক্ষণসহ গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। বন হিসেবে গেজেটভুক্ত ও ব্যবস্থাপনার জন্য অধিগ্রহণ, হস্তান্তর বা ন্যস্তকৃত, চিহ্নিত সকল ভূমি বা এলাকা এবং উপকূলীয় চরাঞ্চলের বনভূমি, প্রাকৃতিক বন, সৃজিত বন ও জলাভূমির বন (Swamp Forest) ইত্যাদিকে বন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এ অধ্যাদেশে।
এই অধ্যাদেশের অন্যতম জনগুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বন, বৃক্ষ ও বনভূমির সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ অধ্যাদেশ অনুযায়ী অবক্ষয়িত বন ফিরিয়ে আনতে, বন, বনভূমি, বনের বাস্তুতন্ত্র, বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা, সম্প্রসারণ ও সংরক্ষণে সরকার কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে । এ অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সকল দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবে বন বিভাগ যারমধ্যে বনের সীমানা নির্ধারণ, অবক্ষয়িত বন পুনরুদ্ধার, বৃক্ষ সংরক্ষণে অংশীজনকে সম্পৃক্ত করা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বন, ঐতিহ্যগত ও প্রথাগত অধিকার সুরক্ষিত রাখা, বনভূমির দখল প্রতিরোধ ও উচ্ছেদ করা, কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে সম্পৃক্ত করা ও তাদের প্রথাগত জ্ঞান চর্চাকে গুরুত্ব প্রদান, বন ও প্রথাগত অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান, সকল ধরনের বনায়নে স্থানীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ ও আগ্রাসী প্রজাতি পরিহার ও অপসারণ নিশ্চিত করা, বিদেশী প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণি আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা এবং সময়ে সময়ে উদ্ভিদ ও প্রাণি প্রজাতির লাল তালিকা প্রস্তুত ও হালনাগাদ করা উল্লেখযোগ্য । এ অধ্যাদেশের বিধান অনুযায়ী গেজেটভুক্ত সকল বনভূমি বন বিভাগের নামে রেকর্ডভুক্ত হবে। রক্ষিত ও অর্জিত বনভূমি জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ডভুক্ত হলেও সার্বিক ব্যবস্থাপনা বন বিভাগের উপর ন্যস্ত থাকবে এবং জেলা প্রশাসকগণ বন বিভাগের ব্যবস্থাপনাধীন বনের জমি বন্দোবস্ত প্রদান করতে পারবেন না । অধ্যাদেশটিতে বনভূমি ও খাসজমি সংক্রান্ত জটিলতা ও সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য যৌথ জরিপ করার এবং বনের অখ-তা রক্ষার্থে বনের অভ্যন্তরে বিদ্যমান ভূমি বন বিভাগের অনুকূলে অধিগ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে । কোনো শিল্প এলাকার ভেতরে এক একরের কম বিচ্ছিন্ন বনভূমি থাকলে, জনস্বার্থ বিবেচনায় তা বিনিময়ের সুযোগ রাখা হয়েছে; তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দ্বিগুণ পরিমাণ নিষ্কণ্টক জমি বন বিভাগকে হস্তান্তর করতে হবে যা পরবর্তীতে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষিত হবে । প্রাকৃতিক বন বন বিরুদ্ধ কাজে ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
গাছ কাটার ক্ষেত্রে অনুমতির বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এ অধ্যাদেশে। সরকারি বন, সামাজিক বন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণপরিসরের গাছ কাটতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে বন সংরক্ষণ কর্মকর্তার অনুমতি নিতে হবে। এমনকি ব্যক্তিমালিকানাধীন গাছও যদি সরকারি ‘কর্তনযোগ্য’ তালিকায় থাকে, তবে সেটির জন্যও আগাম অনুমতির প্রয়োজন হবে। তবে রোগাক্রান্ত বা মৃত, ঝড়ে পড়া, সড়ক যোগাযোগে বাধাসৃষ্টিকারী, প্রাকৃতিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ গাছ কাটতে কোনো আগাম অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না।
এ অধ্যাদেশের অধীন গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধমে প্রকাশিত কর্তন নিষিদ্ধ প্রজাতির গাছ বা বন অধিদপ্তর কর্তৃক ঘোষিত বিপদাপন্ন কোনো গাছ কাটলে অপরাধীকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা প্রদান করতে হবে । এক্ষেত্রে আদালত অতিরিক্ত দ- হিসেবে ক্ষতিপূরণমূলক বনায়নের বিষয়টি বিবেচনায় করতে পারবেন। কেবল গাছ কাটাই নয়, কোনো গাছের ক্ষতিসাধন করার উদ্দেশ্যে ধাতব বস্তু বা পেরেক প্রবেশ করালে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে অধ্যাদেশটিতে । এছাড়া সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা, কর্পোরেশন, অধিদপ্তর, বোর্ড, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এ অধ্যাদেশের কোন বিধান লঙ্ঘন করলে শাস্তি হবে সর্বোচ্চ ৩০০০০০ (তিন লক্ষ) টাকা ।
পরিবেশবাদীদের দীর্ঘ আন্দোলন ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণে সংরক্ষণধর্মী ও জনমুখী অধ্যাদেশ প্রণীত হলো। এ অধ্যাদেশের সফল প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন দেশের পরিবেশগত নিরাপত্তা জোরদার করবে। বন, বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে, ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন গাছ কাটা এবং বনভূমি গ্রাস করার প্রবণতা বন্ধে এ আইনি কাঠামোটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে যার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বনভূমি রক্ষায় সরকারের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি।





