বুড়িগঙ্গার তীরঘেঁষা কামরাঙ্গীরচর ও আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে ঘিঞ্জি ও অপরিকল্পিত অসংখ্য ছোট ছোট প্লাস্টিক কারখানা। সহজলভ্য শ্রমশক্তি ও কম মজুরির ওপর নির্ভর করে বছরের পর বছর বেড়ে উঠেছে এই শিল্প। অধিকাংশ কারখানা পরিচালিত হচ্ছে আবাসিক বা আবাসিক-কাম-বাণিজ্যিক ভবনে, এমনকি অনেক কারখানা গড়ে উঠেছে সরাসরি আবাসিক এলাকার মাঝেই।
এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা। তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে রয়েছে অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, অগ্নিঝুঁকি, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের নানা সংকট। কারখানাগুলোতে শুধু পুরুষ নয়, নারী ও শিশুশ্রমিকদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকার অনেক মানুষ এসব প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করেন। কিন্তু শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (PPE) প্রায় অনুপস্থিত। প্রতিদিন প্লাস্টিক বর্জ্য, রাসায়নিক পদার্থ ও ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রপাতির সংস্পর্শে কাজ করলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় না।
খোলা ও অনুমোদনহীন কাটিং এবং প্লাস্টিক গলানোর যন্ত্রে কাজ করতে গিয়ে ঘটছে দুর্ঘটনা ও দগ্ধ হওয়ার ঘটনা। আবার গলানো প্লাস্টিক ও রাসায়নিক উপাদান থেকে নির্গত ধোঁয়া নিয়মিত শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শ্রমিকদের শ্বাসতন্ত্র। স্থানীয় ছোট কারখানাগুলোর ৭৫ শতাংশেরও বেশি শ্রমিক মাস্ক, গ্লাভস বা নিরাপত্তা চশমা ছাড়াই প্লাস্টিক স্ক্র্যাপ নিয়ে কাজ করেন।
অগ্নিঝুঁকিও কম নয়। ছোট ছোট কারখানার ভেতরে হাজার হাজার কেজি প্লাস্টিক স্ক্র্যাপ, পেলেট ও ফ্লেক স্তূপ করে রাখা হয়—যেগুলো অত্যন্ত দাহ্য। টিন, কাঠ ও লোহার অ্যাঙ্গেল বার দিয়ে নির্মিত এসব স্থাপনায় অনেক সময় বৈদ্যুতিক তারও খোলা অবস্থায় থাকে। ফলে শর্ট সার্কিটের সামান্য ঘটনাতেই মজুত প্লাস্টিকে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
কারখানার ভেতরের ঝুঁকি শুধু শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্লাস্টিক বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা পুরো এলাকার পরিবেশ ও জনজীবনকে প্রভাবিত করছে।
কামরাঙ্গীরচরের খালগুলোতে জমছে প্লাস্টিক বর্জ্য। পানি প্রবাহের পথ আটকে যাচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা। সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। কারখানার বর্জ্য, বাতিল প্লাস্টিক ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক রাস্তার পাশে, ড্রেন ও জলাশয়ে ফেলার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে, প্লাস্টিক বর্জ্য পোড়ানোর ফলে তৈরি হচ্ছে কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর ফলে বায়ুদূষণের পাশাপাশি কাশি, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, চোখে জ্বালাপোড়া ও ত্বকের সমস্যার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)’র একটি টীম, ১৪ মে ২০২৬ তারিখে কামরাঙ্গীরচরে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক (SUP) ও প্লাস্টিক বর্জ্য দূষণের প্রভাব নিয়ে একটি কমিউনিটি কনসালটেশনের আয়োজন করে। সভায় স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্লাস্টিক পুনউৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরা অংশগ্রহণ করেন।
অনিয়ন্ত্রিত প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অনিরাপদ কারখানা পরিচালনার কারণে সৃষ্ট দূষণ, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের অবক্ষয় বিষয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগ জানাই ছিল এই পরামর্শ সভার মূল উদ্দেশ্য।
জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পকে বন্ধ করে দেওয়া নয়, প্রয়োজন নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধবভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করা।
কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বাধ্যতামূলক PPE ব্যবহার, অগ্নিনিরাপত্তা ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক পোড়ানো বন্ধ করা এবং খাল-জলাশয় রক্ষায় কার্যকর নজরদারি এসব পদক্ষেপ এখন আর বিলাসিতা নয়, জরুরি প্রয়োজন।
কামরাঙ্গীরচরের মানুষের জীবিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং একটি বাসযোগ্য পরিবেশ।





